প্রয়াত শাহ আহমদ শফীর উত্তরসূরি নির্বাচনে হেফাজতে ইসলামের সম্মেলন শুরু হয়েছে। চট্টগ্রামের হাটহাজারী দারুল উলুম মঈনুল ইসলাম রোববার সকাল সাড়ে ১০টায় শরু হওয়া এই সম্মেলনে সারা দেশ থেকে সংগঠনটির প্রায় ৪০০ প্রতিনিধি অংশ নিয়েছেন। তবে সম্মেলনে অংশ নেননি আহমদ শফীর ছেলে আনাস মাদানী ও তার অনুসারীরা।

এদিকে এই সম্মেলনকে অবৈধ বলে আখ্যা দিয়েছেন আমন্ত্রণ না পাওয়া নেতারা। এমন পাল্টাপাল্টি অবস্থানের ফলে সংগঠনে ভাঙনের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

হেফাজতের জ্যেষ্ঠ নায়েবে আমির মুহিবুল্লাহ বাবুনগরী সম্মেলন আহ্বান করেছেন। বিরোধীরা দাবি করছেন, মুহিবুল্লাহকে বহিস্কার করা হয়েছিল, তাই তিনি সম্মেলন আহ্বান করতে পারেন না। আর মুহিবুল্লাহর সমর্থকরা বলছেন, তিনি পদত্যাগপত্র জমা দিলেও আহমদ শফী তা গ্রহণ করেননি। ফলে তিনি সংগঠনেই আছেন।

এদিকে বর্তমান মহাসচিব মাওলানা জুনায়েদ বাবুনগরী আমির হতে পারেন বলে কেউ কেউ মনে করছেন। এ ছাড়া কয়েকজনের নাম আলোচনায় থাকলেও তাদের ধারণা, মহাসচিব হতে পারেন ঢাকা মহানগরের সভাপতি মাওলানা নূর হোসেইন কাসেমী। তিনি বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলের শরিক জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের মহাসচিব।

বাবুনগরী ও কাসেমীকে বিএনপি-জামায়াত ঘনিষ্ঠ বলে আখ্যা দিয়েছেন সম্মেলন-বিরোধীরা। তারা শনিবার চট্টগ্রাম ও ঢাকায় সংবাদ সম্মেলন করে হুঁশিয়ার করেছেন, একতরফা কমিটি মানা হবে না।

বিরোধীরা হেফাজত নামেই পাল্টা সংগঠন গড়তে পারেন বলেও আলোচনা চলছে। কাউন্সিল-বিরোধীরা কাউন্সিলপন্থিদের যেমন সরকারবিরোধী বলে আখ্যা দিচ্ছে, তেমনি কাউন্সিলপন্থিরা তাদের বিরোধীদের সরকারপন্থি আখ্যা দিচ্ছে।

আহমদ শফীর নেতৃত্বে গঠিত হওয়ার প্রথম চার বছর কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক সংগঠন হেফাজত চট্টগ্রামে সীমাবদ্ধ ছিল।

ইসলাম অবমাননায় মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে আইন প্রণয়নসহ ১৩ দফা দাবিতে ২০১৩ সালের ৬ এপ্রিল ঢাকায় সমাবেশ করে জাতীয়ভাবে আলোচনায় আসে হেফাজত। ওই বছরের ৫ মে সংগঠনটির নেতাকর্মীরা একই দাবিতে মতিঝিলের শাপলা চত্বরে অবস্থান নেন। মধ্যরাতে তাদের উচ্ছেদ করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

তবে এর পর থেকে হেফাজত অনেকটাই নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়। জুনায়েদ বাবুনগরীসহ কয়েকজন মতিঝিলের সহিংসতার মামলায় জেলে গেলেও আহমদ শফীকে চট্টপ্রামে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

২০১৮ সালে সরকার কওমি মাদ্রাসার দাওরায়ে হাদিসকে স্নাতকোত্তরের সমমান দিয়ে হেফাজতের দীর্ঘদিনের দাবি পূরণ করে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ধন্যবাদ জানিয়ে সমাবেশ করেন হেফাজত নেতারা। কিন্তু এর বিরোধিতা করে মুহিবুল্লাহ বাবুনগরী পদত্যাগ করেন।

এদিকে সম্মেলন ডাকা নিয়ে হেফাজতের যুগ্ম মহাসচিব মুফতি ফয়জুল্লাহ প্রশ্ন তুলেছেন, পদত্যাগকারী নেতা কী করে সম্মেলন ডাকেন? আরেক যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা মঈনুদ্দিন রুহি একই কথা বলেছেন।

তার বক্তব্য, পদত্যাগকারী নেতার সম্মেলন আহ্বানের এখতিয়ার নেই। জুনায়েদ বাবুনগরীর বিরোধী হিসেবে পরিচিত এই দুই নেতার নেতৃত্বেই সম্মেলনের বিরোধিতা চলছে। তাদের সঙ্গে আহমদ শফীর দুই ছেলে রয়েছেন বলে দাবি করা হলেও তাদের প্রকাশ্যে দেখা যায়নি।

হেফাজতের সাংগঠনিক সম্পাদক আজিজুল ইসলাম ইসলামবাদী বলেছেন, মুহিবুল্লাহ বাবুনগরীর পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেননি আহমদ শফী।

এ হিসেবে মুহিবুল্লাহ হেফাজতে বহাল রয়েছেন। তাই তিনি সম্মেলন আহ্বান করতে পারেন। এসব নিয়ে মুহিবুল্লাহ বাবুনগরী মন্তব্য করতে রাজি হননি।

গত ১৮ সেপ্টেম্বর আহমদ শফীর মৃত্যুর আগে থেকেই তার উত্তরাধিকার নিয়ে বিরোধ চলছে। তিনি একাধারে হেফাজত আমির, কওমি মাদ্রাসার নিয়ন্ত্রক সংস্থার চেয়ারম্যান, বেফাকুল মাদ্রাসিল আরাবিয়ার (বেফাক) সভাপতি এবং হাটহাজারীর মাদ্রাসার মহাপরিচালক ছিলেন। মৃত্যুর আগের দিন তিনি মহাপরিচালক পদ ছেড়েছিলেন।

জুনায়েদ বাবুনগরীকে একসময় হাটহাজারী মাদ্রাসায় আহমদ শফীর উত্তরসূরি মনে করা হতো। কিন্তু গত জুনে তাকে মাদ্রাসার সহকারী পরিচালকের পদ থেকে সরানো হয়। তখন আহমদ শফীর ছোট ছেলে ও হেফাজতের প্রচার সম্পাদক মাওলানা আনাস মাদানী উত্তরসূরি হতে পারেন বলে আলোচনা শুরু হয়।

তবে পরে পরিস্থিতি বদলে যায়। হেফাজত আমিরের মৃত্যুর আগের দিন আন্দোলনের মুখে আনাস মাদানীকে মাদ্রাসা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। আহমদ শফীর মৃত্যুর পর আনাস মাদানীর অনুসারীদেরও অব্যাহতি দেওয়া হয়।

এরপর জুনায়েদ বাবুনগরী প্রধান শায়খুল হাদিসের দায়িত্বে ফিরেছেন। তিনজন জ্যেষ্ঠ শিক্ষক যৌথভাবে মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করেছেন।

বেফাকেও জায়গা হয়নি আনাস মাদানীর অনুসারী ও জুনায়েদ বাবুনগরী বিরোধীদের। ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হয়েছেন রাজনীতির বাইরের মানুষ মাওলানা মাহমুদুল হাসান। ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হয়েছেন খেলাফত মজলিশের মহাসচিব মাওলানা মাহফুজুল হক।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here