ক’রোনা ম’হামা’রিতে সবচেয়ে আলোচিত বি’ষয় মানুষের রো’গ প্রতিরোধ ব্যবস্থা এবং সে অনুযায়ী নিজস্ব ক্ষ’মতা। যেহেতু এখনও কোনো সুনির্দিষ্ট চিকিৎসা ব্যবস্থা এমনকি কোনো ভ্যাকসিন আবি’ষ্কৃত হয়নি, সেহেতু ব্যক্তিবিশেষের রো’গ প্রতিরোধ ক্ষ’মতাই ভরসা।

আর এই রো’গ প্রতিরোধ ক্ষ’মতা কোনো একটি নির্দিষ্ট খাবার খেলে বা কাজ করলে রাতারাতি তৈরী হয়ে যায় না। এটা আমাদের সুসমন্বিত জীবন ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার ফলাফল।

পুষ্টি উপাদান বিবেচনায় নিয়মিত স্বাস্থ্যকর খাবার, প’র্যাপ্ত ঘুম, অতিরিক্ত উ’দ্বেগ নিয়’ন্ত্রণ, নিয়মিত শা’রীরিক ব্যায়াম, ক্ষ’তিকর অ্যালকোহল ও ধুমপান থেকে বিরত থাকা এবং দীর্ঘস্থায়ী রো’গগুলোর সুষ্ঠু নিয়’ন্ত্রণের মাধ্যমে আপনি আপনার রো’গ প্রতিরোধ ক্ষ’মতাকে কার্যকর রাখতে পারেন, বাড়াতে পারেন।

এই রো’গ প্রতিরোধ ব্যবস্থাটা অনেকটা অর্কেস্ট্রা’র মতো। অর্কেস্ট্রার একটা কাঙ্খিত ও ভালো অনুষ্ঠানের জন্য প্রত্যেকটা বাদ্যযন্ত্রকে সমানতালে পরিকল্পনা অনুযায়ী বাজাতে হয়।

কোনো একটা বাদ্যযন্ত্র খা’রাপ বাজিয়ে আর একটা একটু বেশি ভালো করে কিংবা জোড়ে বাজিয়ে পুরো পারফরমেন্সকে ভালো করা যায় না। শ’রীরের রো’গ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকেও কার্যকর রাখতে দরকার সেরকম কিছু স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা বা অভ্যাসের সুসমন্বয়। আসুন জেনে নেই সেগুলো স’ম্পর্কে-

নিয়মিত স্বাস্থ্যকর খাবারঃ

স্বাস্থ্যকর খাবার মানে সবদিন সববেলা উন্নতমানের দামি খাবার নয়। খাদ্য উপাদান মেনে সঠিক সময়ে সঠিক মানের খাদ্য গ্রহণ করাটাই স্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণ।

অর্থ্যাৎ শর্করা, প্রোটিন ও চর্বির প্রয়োজনীয় সমন¦য়। মনে রাখতে হবে প্রতিবেলার খাবারে যেনো কোনোভাবেই শর্করার পরিমান ৫০ ভাগের বেশী না হয়। বাকি ৫০ ভাগের মধ্যে চর্বি ৩০ ভাগ ও পোটিন ২০ ভাগ।

প্রোটিন শ’রীরের রো’গ প্রতিরোধ ক্ষ’মতা বাড়ায়। এর এমাইনো এসিড রো’গ প্রতিরোধক কোষ তৈরীতে সহায়তা করে। নিয়মিত ডিম, মাছ (সামুদ্রিক মাছ হলে ভালো), চর্বিহীন মাংস (মুরগির মাংস) ও ডাল থেকে প্রয়োজনীয় প্রোটিন পাওয়া যায়। লাল মাংসে ভালো প্রোটিন পাওয়া যায় না। তাই এটি এড়িয়ে চলতে পারলে অন্য সুবিধাও পাওয়া যাবে।

খাবারের জিংক, ফলিক এসিড, আয়রন, সেলেনিয়াম, কপার, ভিটামিন-এ, সি, ই, বি-৬ এবং বি-১২ উপাদানগুলোতে রো’গ প্রতিরোধ ক্ষ’মতা বৃ’দ্ধির গুনাবলী আছে। ভিটামিন-সি এর কথাই ধরুন, যা বেশি পাওয়া যায় লেবু, কিউই, কমলা, পেয়ারা, আমলকী, জাম্বুরা, আমড়া এবং কপি জাতীয় সব্জিতে, এসব খাবারের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রো’গ প্রতিরোধ ক্ষ’মতা বাড়ায় এবং শ’রীরের যে কোনো সং’ক্র’মণ প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

আমাদের শ’রীর ভিটামিন-সি জমা রাখতে পারে না, তাই এটি প্রতিদিন গ্রহণ করতে হয়। একজন পূর্ণবয়স্ক পু’রুষের প্রতিদিন ৯০ মিলিগ্রাম এবং না’রীর ৮০ মিলিগ্রাম ভিটামিন-সি দরকার। তেমনি খাবারের জিঙ্ক র’ক্তের শ্বেতকণিকার কার্যক্ষ’মতা নিয়’ন্ত্রণ করে শ’রীরের রো’গ প্রতিরোধ ক্ষ’মতা বৃ’দ্ধি করে। পরিমিত জিঙ্ক পেতে হলে নিয়মিত বাদাম, শিম, দু’ধ ও দুগ্ধজাত খাবার খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।

উদ্ভিদ জাত বিশেষ করে ফল, সব্জি, ওষধি এবং কিছু মসলা জাতীয় খাবারের পুষ্টি উপাদান শ’রীরের রো’গ প্রতিরোধ ক্ষ’মতা বাড়াতে সাহায্য করে। ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অফ মলিকিউলার সাইন্সেস-এর এক গবেষনাপত্রে দেখা গেছে মসলা জাতীয় খাবার যেমনঃ লবঙ্গ, পুদিনা পাতা, দারচিনি এবং জিরায় থাকা ভাই’রাস ও ব্যাকটেরিয়া ধ্বং’সকারী উপাদান খাদ্যের মান ও গুনগত মানও অক্ষুন্ন রাখে।

অতিরিক্ত উ’দ্বেগ নিয়’ন্ত্রণঃ

অতিরিক্ত ও দীর্ঘমেয়াদী উ’দ্বেগ শ’রীরে স্টেরয়েড হরমোন কর্টিসল এর মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। ক্রমাগত উচ্চ মাত্রার কর্টিসল রো’গ প্রতিরোধক ব্যবস্থাকে অকার্যকর করে, ফলে শ’রীর ভাই’রাস ও ব্যাকটেরিয়ার সম্ভাব্য আ’ক্রমণ প্রতিহত করতে পারে না। কাজেই উ’দ্বেগ নিয়’ন্ত্রণে রাখু’ন। দরকার হলে ধ্যান কিংবা এমন সব কাজে নিজেকে নিমগ্ন করুন যা আপনার মনে প্রশান্তি আনবে, আপনাকে উৎফুল্ল রাখবে।

প’র্যাপ্ত ভালো ঘুমঃ

প’র্যাপ্ত ঘুম শ’রীরের রো’গ প্রতিরোধ ক্ষ’মতার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ন। ইউরোপিয়ান জার্নাল অব ফিজিওিলজি’র মতে, আমরা যখন ঘুমাই তখন শ’রীর সাইটোকাইনেজ এবং টি-সেল নিঃসরণ করে। সাইটোকাইনেজ একধরনের প্রোটিন, যা শ’রীরে যে কোন ধরনের সং’ক্র’মণের বি’রুদ্ধে লড়াই করে এবং প্রদাহ উন্নীত করে। অন্যদিকে র’ক্তের শ্বেতকনিকার ন্যায় টি-সেল শ’রীরের রো’গ প্রতিরোধ ক্ষ’মতা নিয়’ন্ত্রণ করে। আর এ কারণেই প’র্যাপ্ত ঘুমের অভাবে ভাই’রাসে আ’ক্রান্ত হওয়া শ’রীর খুব দ্রুত অ’সুস্থ হয়ে পরে এবং সুস্থ হওয়ার যে পর্যায়গুলো আছে তারও গতি মন্থর হয়ে পরে।

ন্যাশনাল স্লিপ ফাউন্ডেশন এর মতে পূর্নবয়স্ক যে কারো প্রতিদিন অন্তত সাত ঘন্টা ঘুমানো উচিৎ। আর ভালো মানের এই ঘুমের জন্য আপনাকে অন্তত দুই ঘন্টা পূর্বে সরকমের ইলেক্ট্রনিক্স বন্ধ করে দিতে হবে এবং উ’দ্বেগপূর্ন বই বা আলোচনা এড়িয়ে চলতে হবে।

নিয়মিত শা’রীরিক ব্যায়ামঃ

নিয়মিত কায়িক শ্রম বা এক্সারসাইজ বা ওয়ার্কআউট যেমনি আপনার দীর্ঘস্থায়ী নানা স্বাস্থ্য সমস্যা যেমনঃ স্থুলতা, ডায়াবেটিস এবং হা’র্টের সমস্যার ঝুঁ’কি কমায় তেমনি বিভিন্ন ভাই’রাস ও ব্যাকটেরিয়ার সং’ক্র’মণের ঝুঁ’কিও কমায়। নিয়মিত শা’রীরিক শ্রম বা এক্সারসাইজ মস্তিস্ক থেকে এন্ডোর্ফিন নিঃসরণ ঘটায়, যা উ’দ্বেগ কমাতে এবং রো’গ প্রতিরোধ ক্ষ’মতা বাড়াতে সহায়তা করে।

সিডিসি’র গাইডলাইন অনুযায়ী একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষের সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট মাঝারী প্রবলতার ব্যায়াম যেমনঃ হাটা বা সাইক্লিং কিংবা ৭৫ মিনিট উচ্চ প্রবলতার ব্যায়াম যেমনঃ দৌড়ানো যেতে পারে। বর্তমান অবস্থা বিবেচনায় সেটা একান্তই না পারলে ছাদে হাটা, গ্যারেজে হাটা, বাসার মধ্যে হাটা, চিৎ হয়ে শুয়ে সাইকেলের মতো করে চা’লানো কিংবা বাসার মধ্যে ফ্রি-হ্যান্ড এক্সারসাইজও করা যেতে পারে।

মাত্রাতিরিক্ত অ্যালকোহল সেবনঃ

মাত্রাতিরিক্ত অ্যালকোহল সেবন শ’রীরের ও’পর নানা নেতিবাচক প্রভাব ফে’লে, এমনকি রো’গ প্রতিরোধ ক্ষ’মতা কমিয়ে দেয়। অ্যালকোহল রিসার্চ সাময়িকী অনুযায়ী অধিকমাত্রার অ্যালকোহল সেবনের কারণে শ’রীরের যেকোনো প্রদাহের বি’রুদ্ধে লড়াই করার ক্ষ’মতা কমে যায় এবং সেড়ে ওঠাও ধীরগতির হয়। দেখা যায়, যারা মাত্রাতিরিক্ত অ্যালকোহল সেবন করেন তারা নিউমোনিয়া, তীব্র শ্বাসতন্ত্রের পীড়া, অ্যালকোহলিক লিভার রো’গসহ ক্যান্সারে বেশী ভোগেন অন্যদের তুলনায়।

কাজেই যারা অ্যালকোহল সেবন করেন না, তারা অ্যালকোহল থেকে দুরে থাকুন। আর যারা মাঝেমধ্যে সেবন করেন তারা মাত্রা বজায় রাখু’ন। এনআইএইচ এর মতে আ্যালকোহলের স্বাস্থ্যসম্মত মাত্রা হলো না’রীদের জন্য দৈনিক এক মাত্রা (চার আউন্স সমপরিমান) আর পু’রুষের জন্য প্রতিদিন দুই মাত্রা।

ধূমপানকে নাঃ

যে কোনো টক্সিন আমাদের রো’গ প্রতিরোধ ক্ষ’মতাকে বা’ধাগ্রস্ত করে। ধূমপানে নির্গত কার্বন মনোক্সাইড, নিকোটিন, নাইট্রোজেন অক্সাইড এবং ক্যাডমিয়াম এর মতো রাসায়নিক উপাদানগুলো শ’রীরের রো’গ প্রতিরোধ ব্যবস্থার কোষগুলো যেমন: সাইটোকাইনেজ, টি-সেল এবং বি-সেলগুলোকে বেড়ে উঠতে বা’ধা দেয় এবং সেগুলোর কাজেও ব্যাঘাত ঘটায়।

আমেরিকান সেন্টার্স ফর ডিজিজ কন্ট্রোল এন্ড প্রিভেনশন এর মতে ধুমপান ফুসফুসের বিভিন্ন ভাইরাল ও ব্যাকটেরিয়াল সং’ক্র’মণ (যেমনঃ নিউমোনিয়া, ফ্লু এবং যক্ষা), অ¯্রােপচার পরবর্তী সং’ক্র’মণ, রিউমাটয়েড আরথ্রাইটিস বা গ্রন্থিপ্রদাহের মতো সমস্যাগুলোর আরো অবনতি করে। কাজেই এখনই ধুমপানকে না বলুন।

দীর্ঘমেয়াদী রো’গগুলোর সুনিয়’ন্ত্রণঃ

দীর্ঘকাল স্থায়ী রো’গ মেমনঃ অ্যাজমা, ডায়াবেটিস এবং হা’র্টের রো’গে শ’রীরের রো’গ প্রতিরোধ ক্ষ’মতা কমে যায়, যাতে সং’ক্র’মণের ঝুঁ’কি বেড়ে যায়। কারেন্ট ডায়াবেটিস রিভিউ’স জার্নাল (অক্টোবর ২০১৯) এর মতে টাইপ-২ ডায়াবেটিস রো’গীরা যারা তাদের র’ক্তের সুগার সুনিয়’ন্ত্রণে রাখতে পারেন না,

যেকোনো প্রদাহের বি’রুদ্ধে সাড়া দেবার ক্ষ’মতা তাদের কমে যায়। এতে শ’রীরের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দূর্বল হয়ে পরে। প্রায় একই ব্যাপার ঘটে অ্যাজমা ও হা’র্টের সমস্যার বেলায়ও।

আপনার যদি এসব দীর্ঘকাল স্থায়ী রো’গগুলোর কোনো একটি বা দুটি থেকে থাকে এবং আপনি যদি ভাই’রাসে আ’ক্রান্ত হন তবে তা থেকে সেড়ে ওঠার জন্য আপনাকে অত্যাধিক প্রচেষ্টা চা’লিয়ে যেতে হবে। কাজেই অ্যাজমা, ডায়াবেটিস এবং হা’র্টের রো’গগুলো সুনিয়’ন্ত্রণে রাখতে হবে শ’রীরের রো’গ প্রতিরোধ ক্ষ’মতা বাড়ানোর জন্য।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here